প্রাকৃতিক সম্পদের বৈশ্বিক দাম নিয়ন্ত্রণ করতে নতুন পণ্য বিনিময় কেন্দ্র বা কমোডিটি এক্সচেঞ্জ খোলার পরিকল্পনা করছে ইন্দোনেশিয়া। তবে সরকারের এ উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নতুন এক্সচেঞ্জে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হলে বিদেশী ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা ইন্দোনেশিয়ার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব বাড়ানোর পরিবর্তে উল্টো দেশটির অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খবর রয়টার্স।
আগামী বছর নতুন এ পণ্যবাজার চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এর পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্ত। মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রসারিত করতেই এ পদক্ষেপ নিচ্ছেন তিনি। ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে বিশ্বে পাম অয়েল, নিকেল ও তাপীয় কয়লার সবচেয়ে বড় উৎপাদক ও রফতানিকারক। একই সঙ্গে তামা ও বক্সাইটেরও বড় উৎপাদক। সম্প্রতি দেশটির সংসদে দেয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট সুবিয়ান্তো স্পষ্ট জানান, কম দামে সম্পদ বিক্রির চেয়ে সেগুলো নিজেদের কাছে রেখে দেয়া বেশি যুক্তিযুক্ত।
নতুন এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পণ্য কেনাবেচা বাধ্যতামূলক করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন কমোডিটি ট্রেডিং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান সারজিতো। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে অর্থনৈতিক কৌশলের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি দেখছেন। দায়িত্ব নেয়ার আট মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর জনপ্রিয়তা ৩০ শতাংশ কমে ৫১ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশটির সাবেক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ইয়ানুয়ার নুগ্রোহোর মতে, এটি নিছক এক ধরনের জাতীয়তাবাদী বার্তা, যা কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই নীতি হতে পারে না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারণ নির্ভর করে পারস্পরিক বিশ্বাস ও স্বচ্ছতার ওপর, সরকারি আদেশের ওপর নয়। বাজার গবেষণা সংস্থা রাইস্টাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সিমেন দেং বলেন, ‘জাকার্তার এ জোরজবরদস্তিমূলক নীতির কারণে ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকতে পারেন। ইন্দোনেশিয়ার কয়লার বড় ক্রেতা দেশ চীন ও ভারত এরই মধ্যে রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মঙ্গোলিয়া থেকে কেনাকাটা বাড়াচ্ছে।’
পাম অয়েলের বাজারও ইন্দোনেশিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৩ সালে নিজস্ব এক্সচেঞ্জ চালু করলেও সেটি এখনো বৈশ্বিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার বুরসা ডেরিভেটিভসে প্রায় ৪৯ কোটি টন পাম অয়েল লেনদেন হয়েছে। বিপরীতে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে লেনদেন হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টন।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক এনার্জি শিফট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ইয়ান হিসকপ বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব তৈরির ক্ষমতা থাকলেও জোর করে দাম নির্ধারণের চেষ্টা উল্টো ফল দিতে পারে। নিয়মে কড়াকড়ি চালু হলে বিনিয়োগকারীরা সরে যেতে পারেন। এতে বাজারের স্বচ্ছতাও কমতে পারে।’
বিশেষ করে নিকেলের ক্ষেত্রে এমন নীতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নিকেলের বিকল্প উপকরণের দিকে আরো দ্রুত ঝুঁকবে। একই সঙ্গে গাড়ি নির্মাতারা নির্ভরযোগ্য দেশগুলোয় নিকেল প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহী হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় উৎপাদক হলেই বৈশ্বিক পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এজন্য দীর্ঘদিনের আস্থা, স্বচ্ছতা ও বাজারের স্বাধীনতা প্রয়োজন। অন্যথায় ইন্দোনেশিয়ার নতুন এক্সচেঞ্জ বৈশ্বিক মূল্য নির্ধারণের কেন্দ্র না হয়ে কেবল একটি ঘরোয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।